parallax background

ঘরোয়া আয়োজনে হোক আকদের অনুষ্ঠান

by Tasnim Jarin

কথা ছিল ফেব্রুয়ারি মাসের শেষে দুই পরিবারের বড়রা একসাথে বসে বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করে ফেলবেন। কিন্তু ঠিক যখনই বিয়ের প্রস্তুতি পর্ব শুরু করার কথা ছিল, তখনই হুট করে চলে আসলো করোনা নামের ভয়ংকর এক ভাইরাস। শুরুর দিকে সবাই অনেকটা এমনই ভাবছিলো যে হয়তো কয়েক সপ্তাহের একটা লকডাউনই  চলবে, এর মধ্যে পরিস্থিতি একটু ভালো হয়ে উঠলেই বিয়ের প্রস্তুতি শুরু করা যাবে। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের লকডাউন যে ধীরে ধীরে  মাসের পর মাস, এমনকি ‘এটাই এখন নরমাল’ হয়ে যাবে, তা হয়তো আমাদের কারোর কল্পনাতেও ছিল না।

মাস যত সামনে এগোলো বিয়ের অনুষ্ঠান করার সম্ভাবনা ততটাই ক্ষীণ হয়ে উঠলো। জুলাই থেকে দূরে সরে যেতে থাকা বিয়ের দিনক্ষণ একটা সময় রীতিমত অনিশ্চয়তার পর্যায়ে চলে গেলো। আর ঠিক তখনই পরিবার থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া হলো বিয়ের মূল অনুষ্ঠান এ বছর আর করাই হবে না। তবে, পারিবারিকভাবে একান্তই কাছের কিছু মানুষকে সাথে নিয়ে ঘরোয়াভাবে আয়োজন করা হবে আকদের অনুষ্ঠান। অর্থাৎ, বিয়েটা হচ্ছে! তবে ধুমধাম করে কোন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে নয়, বরং খুবই সাধারণ আয়োজনের সাথে ঘরোয়া পরিবেশে। তাই ঠিক করা হলো আকদের আয়োজন একদম পারিবারিকভাবে বাড়িতেই করা হবে।

শুরুতেই আসি বিয়ের পোশাক শাড়ি এবং পাঞ্জাবি কেনা প্রসঙ্গে। যেহেতু শাড়ির জন্য মিরপুরের বেনারসি পল্লী বেশ নামকরা। আর এখানে গেলে নিশ্চিত শাড়ি পছন্দ হবে। তাই ওখান থেকেই কিনে ফেলা হলো শাড়ি। আর পাঞ্জাবির জন্য যাওয়া হলো আড়ং-এ।

অনুষ্ঠানটা যেহেতু বাসায় হচ্ছে তাই ঘর সাজানোর জন্য বিশেষ করে ড্রইং রুম যেখানে মেহমানরা বসবেন সে জায়গার জন্য বিশেষ কিছু প্ল্যান করা হলো।  

বাসার রঙ অফ হোয়াইট, তাই ঘর সাজানোর থিম ঠিক করা হলো মেরুন এবং গ্রিন। এবার প্ল্যান অনুযায়ী কুশন কভার, কালারফুল কিছু ফুল, টেবিল রানার এবং সুগন্ধি মোমবাতি কিনে আনা হলো। আর সেই সাথে মরিচ বাতি দিয়ে রুমের একটি কর্নার সুন্দর করে সাজানো হলো।

অন্যদিকে কনের রুমেরও এক অংশে মরিচ বাতি দিয়ে সাজানো হলো, সাথে গোল্ডেন ফ্লাওয়ার স্টিক এবং সুগন্ধি মোমবাতিও রাখা হলো। এই রুমের থিম কালার ছিল গোল্ডেন। যেহেতু শাড়ির রঙ লাল, তাই কম্বিনেশনটা বরাবরের মতোই ছিলো ক্ল্যাসি। ঘর সাজানোর পুরো প্ল্যানে কিন্তু কোন ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ছিলো না, বরং ছিলো ছোট মামা আর খালা। একেবারে মনের মতো করে সাজানো হয়ে গেল বাসার বিশেষ জায়গাগুলো। 

সিঁড়ি ঘর আর ছাদের অংশ সাজানোর জন্য পিচ্চি কাজিনরা চার্ট পেপার দিয়েই কাগজের দারুণ কিছু নকশা করে ফেললো। অন্যদিকে ভাইয়া আগে থেকেই ফুলের জন্য শাহবাগের দোকানগুলোর সাথে কথা বলে রেখেছিল। বাসায় ফুল আসার সাথে সাথেই কাজিনরা সবাই মিলে ফুল আর মরিচাবাতি দিয়ে ঘর সাজানোর কাজে লেগে গেলো।    

এ যেন শুধু কোন আকদের অনুষ্ঠানই নয়, পারিবারিক মিলন মেলা। পরিবারের ছোট-বড় সবাই মিলে বিশেষ এই মুহূর্তটিকে ভালোবাসায় পূর্ণ করে তুলতে যেন কোন কমতি রাখলো না।

এতক্ষণ তো ছোটদের কথা বললাম, এবার আসি বাড়ির বড়দের কথায়। মেয়ের বিয়ে বলে কথা, মা-বাবার ব্যস্ততা যেন অন্য মাত্রায় পৌঁছে গেলো। কিন্তু ফুপি-চাচীরা থাকতে চিন্তা কিসের! রান্নার প্রধান দায়িত্বটা তুলে নিলেন বড় ফুপি। ঠিক হলো বাইরে থেকে নয়, বরং রান্নাবান্না হবে বাসাতেই। কাচ্চি, কাবার, বোরহানি, রেজালা ইত্যাদি আইটেমগুলো ফুপি এবং দুই চাচী মিলেই বাসায় করে ফেললেন। অন্যদিকে ডেজার্ট এক্সপার্ট খালা জর্দা, মিষ্টি আর দারুণ সুন্দর দেখতে ওয়েডিং কেক বানিয়ে নিয়ে আসলেন। আর অতিথি আপ্যায়নে চাচা আর খালুদের তো যেন কোন জুড়ি নেই।    

অনুষ্ঠানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ যে এখনও বাকি! আর তা হলো কনের সাজ। তবে বড় বোন আর কাজিন থাকলে কি আর কোনো চিন্তা থাকে? শাড়ি পরানো থেকে শুরু করে মেকআপের পুরো দায়িত্বে ছিলো প্রিয় এই মানুষগুলো। আর মেহেদি পরানোর কাজটা করেছে ছোটবেলার বেস্ট ফ্রেন্ড।       

পুরো অনুষ্ঠানের ছবি তোলার কাজটি করেছে ফটোগ্রাফার ফ্রেন্ডরা মিলে। অনুষ্ঠানের প্রতিটি ছোট ছোট অনুভূতি যেন ফুটে উঠেছে সেই ছবিগুলোতে। জীবনের নতুন এক অধ্যায়ের শুরুতে পরিবারের সবার এই আন্তরিকতা আর ভালোবাসায় বিশেষ এই মুহূর্তটি যেন আরও বিশেষ হয়ে উঠেছে।   

আর এভাবে ঘরোয়া আয়োজনের মধ্য দিয়েই হয়েছিল আকদের অনুষ্ঠান। যদিও সময়টা বেশ কঠিন ছিলো, তবুও কঠিন সময়ে পরিবারের সবার উপস্থিতিতে ঘরোয়াভাবে আয়োজন করা জীবনের নতুন এক যাত্রার এই মুহূর্ত যেন অন্যসব অনুষ্ঠানের চেয়েও বেশি মিষ্টি এবং ভালোবাসায় ভরপুর।

  •  
  •  
  •  
  •   

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *